চাকরি ছেড়ে অনলাইনে চাল-ডাল বেচে কোটিপতি

অনলাইন কেনাকাটার সঙ্গে পরিচিত নন এমন মানুষ কমই আছেন। জামা-কাপড় থেকে শুরু করে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে এখন অনলাইন মার্কেটে ভরসা রাখছেন সবাই। করোনা মহামারিতে মানুষ অনলাইন কেনাকাটায় অভ্যস্ত হয়েছে দ্রুত। তবে কয়েক বছর আগেও হয়তো অনেকেই অনলাইনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বিষয়টা ভাবতেই পারেননি।আজকাল মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন সবাই। তবে জানেন কি? এই সেবাদাতাদেরও ভাগ্য বদলেছে। হয়েছেন সফল উদ্যোক্তা। তবে গতানুগতিক যে কাহিনি আমরা প্রায় শুনি তার থেকে এই উদ্যোক্তার কাহিনি খানিকটা ভিন্ন।

অলবিন্দ্র ঢিঢসার মোটা অংকের বেতনের চাকরি ছেড়ে শুরু করেন ব্যবসা। মাত্র ৯ বছরে আয় করেন ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। ২০২০ সালের অর্থবর্ষে যার মুনাফার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। তার সংস্থার কাজ হচ্ছে দ্রুতগতিতে মুদি দোকানের জিনিসপত্র ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া। এককালে গ্রোফার্স নামে পরিচিত সেই সংস্থাই ব্লিঙ্কিট হিসেবে নতুন চেহারায় এসেছে।২০২১ সালে জাপান, আমেরিকার বিনিয়োগকারীরা ৬৩ কোটি ডলার অর্থ বিনিয়োগ করেছেন ব্লিঙ্কিটে। ভারতীয় মুদ্রায় যার অর্থমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। তবে এই পথ এতটাও মসৃণ ছিল না। বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে বিদেশ পড়ুয়া এই তরুণকে।

অলবিন্দ্র দিল্লির আইআইটি থেকে স্নাতক শেষে পাড়ি জমান আমেরিকায়। আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করেন। এরপর নিজ দেশে ফিরে আসেন অলবিন্দ্র।তার আগে ২০০৫ সালে আমেরিকার বহুজাতিক সংস্থা ইউআরএস করপোরেশনে ট্রান্সপোর্টেশন অ্যানালিস্ট হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন অলবিন্দ্র। দু’বছর পর সংস্থা বদল করে কেমব্রিজ সিস্টেমেটিক্সের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হন। আমেরিকার ওই দুই বহুজাতিক সংস্থায় মোটা বেতনে চাকরি করলেও তখন থেকেই নিজের সংস্থা খোলার ইচ্ছে পুষে রেখেছিলেন। আচমকাই সে সুযোগ এসে যায়।আমেরিকায় কাজ করার সময়ই তার পরিচয় হয় সৌরভ কুমারের সঙ্গে। সৌরভ তখন কেমব্রিজ সিস্টেমেটিক্সে তার সহকর্মী। তাকে নিয়েই শুরু করেন সেই স্বপ্ন পূরণের যাত্রা। দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু একটা ব্যবসা শুরু করার মতো টাকা নেই।

আবার শুরু করলেন চাকরি। ইন্টারন্যাশনাল অপারেশনসের প্রধান হিসেবে জোম্যাটোতে চাকরি শুরু করেন অলবিন্দ্র। উদ্দেশ্য ছিল রোজগারের পাশাপাশি হাতেকলমে খাবার ডেলিভারি দেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করা। ডেলিভারির সময় কী কী বাধার সম্মুখীন হতে হয়, সে দিকেও নজর রাখতেন অলবিন্দ্র।চাকরি নয়, ব্যবসা করতে হবে। ভাবনাটা জেঁকে বসেছিল মনে। ততদিনে খাবার সরবরাহকারী সংস্থা জোম্যাটোয় প্রায় তিন বছর কেটে গেছে। এক সময় মোটা মাইনের চাকরি ছাড়ার ঝুঁকিও নিয়ে ফেললেন অলবিন্দ্র। ততদিনে অবশ্য স্টার্ট-আপের খুঁটিনাটি আয়ত্ত করে ফেলেছেন।এমন অবস্থায় শুরু করেন প্রস্তুতি। পাশে পেয়েছিলেন তার এককালের সহকর্মী সৌরভকে। দেশে ফিরে এলেও বরাবরই সৌরভের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল অলবিন্দ্রর। যদিও শুরুতে গ্রোফার্স নয়, ওয়াননাম্বার নামে একটি ডেলিভারি সংস্থা খুলেছিলেন অলবিন্দ্র এবং সৌরভ। সেটি ছিল ২০১৩ সাল। শুরুতে দোকানির থেকে জিনিসপত্র নিয়ে তা পাড়াপড়শিকে পৌঁছে দিত ওয়াননাম্বার।মাঠে নেমে কাজের কী কী অসুবিধা, তা জানতে অলবিন্দ্র এবং সৌরভও ডেলিভারি করেছেন। চার কিলোমিটারের মধ্যে কমপক্ষে ৫০-৬০টি ডেলিভারি দিয়েছেন তারা। খুঁটিয়ে জেনেছেন দোকানি এবং গ্রাহকের অসুবিধার কথাও। স্টার্ট-আপ সংস্থাটি মুনাফার মুখ দেখলেও বড়সড় লক্ষ্যভেদ করতে চাইছিলেন অলবিন্দ্র।জোম্যাটোতে কাজ করার সময়ই তুখোড় বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন অলবিন্দ্রর। ওয়াননাম্বার শুরুর পর খেয়াল করেছিলেন, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অর্ডার দেওয়া হয় মুদিদোকানের জিনিসপত্র ও ওষুধ। তবে সেসব অর্ডার ঠিকঠাক দেওয়া হলেও গ্রাহক পরিষেবা নিয়ে এ দেশে বেশ অসুবিধা রয়েছে। সেই সুযোগই কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন অলবিন্দ্র।

সেই ভাবনা থেকেই জন্ম হয় গ্রোফার্সের। অ্যাপের মাধ্যমে লোকজনের ঘরে ঘরে চটজলদি মুদির জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়ার সংস্থা। ২০১৩ সালে ওয়াননাম্বারের ভোল পাল্টে গ্রোফার্স শুরু করেন অলবিন্দ্র এবং সৌরভ। হরিয়ানার গুরুগ্রামে হয় সংস্থার সদর দপ্তর।তবে মুদ্রার দুই পিঠ দেখে ফেলেছিলেন তারা। গ্রোফার্স শুরু মাত্র তিন বছরের মধ্যেই সাফল্য-ব্যর্থতা দুইয়ের মুখ দেখেছিলেন অলবিন্দ্র। ২০১৫ সালে জাপানের সফ্টব্যাঙ্ক গোষ্ঠীর সঙ্গে ৮০০ কোটি টাকার চুক্তি সেরে দেশের হাইপার-লোকাল সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রথমসারিতে বসে পড়ে গ্রোফার্স।তবে ২০১৫-’১৬ অর্থবর্ষে লোকসানও দেখেছিলেন। সে সময় মুনাফা ছিল মাত্র ১৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। আর লোকসান ২২৫ কোটির। বাধ্য হয়েই সংস্থার ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটার পাশাপাশি দেশের ৯টি শহরে শাখা চালু করেন তারা।দমে যাননি একদমই। ব্যর্থতার থেকেই সাফল্যের পথ খুঁজে বার করেন অলবিন্দ্র। গ্রোফার্সের মোবাইল অ্যাপ ছাড়লেন বাজারে। গুরুগ্রাম, বেঙ্গালুরুসহ বেশ কয়েকটি শহরে অর্ডার দেওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে জিনিসপত্র পেয়ে যেতেন গ্রাহকেরা।

দিল্লি, গুরুগ্রাম এবং বেঙ্গালুরুতে একটি ৬০ হাজার বর্গফুটের গুদামের ব্যবস্থাও করে ফেলেন অলবিন্দ্র। তাতে মুদির দোকানের জিনিসপত্র মজুত থাকত। অর্ডার এলে সেখান থেকেই মালপত্র গ্রাহকদের ঘরে পৌঁছে যেত। অনলাইনে অর্ডার নিয়ে ডেলিভারি দেওয়ার সংস্থা দেশে কম নয়। বিগ বাস্কেট বা জিওমার্টের মতো বাঘা বাঘা স্টার্ট-আপ কোম্পানি রয়েছে। তবে চটজলদি ডেলিভারি দিয়ে পরিচিতি ও লাভের মুখ দেখতে শুরু করে তাদের সংস্থা।এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি গ্রোফার্স ও অলবিন্দ্রকে। হুহু করে বাড়তে থাকে মুনাফা। বড় হতে থাকে তাদের সংস্থা। সফল হলেও ফের গ্রোফার্সকে নয়া রূপ দিয়েছেন অলবিন্দ্র। গত বছর তা নতুন লোগো এবং নাম নিয়ে বাজারে আসে গ্রোফার্স।এবার ব্লিঙ্কিট। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি দেশের ৩০টিরও বেশি শহরে শাকসবজি, মোবাইল, বইখাতা থেকে প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীসহ সব ধরনের পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে গ্রোফার্স।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*